বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

দ্বীনের শিক্ষাদান ও প্রচার করে বিনিময় নেওয়া ‍যাবে কি?


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- “হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে।  (সূরাঃ আস-সফ, আয়াত ১০-১১)

খেয়াল করুন, আল্লাহ তায়ালা এখানে ধন-সম্পদ ও জীবন বিলিয়ে দিয়ে তার পথে জিহাদ করতে বলেছেন এবং এই কাজকে কল্যাণকর বলে সাব্যস্ত করেছেন।

আল্লাহ আরো বলেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মাল খরিদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।” [সূরা তাওবা, আয়াত: ১১১]

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার করে বলে দিলেন যে, তিনি মুমিনদের জান এবং মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। অর্থাৎ দুনিয়াতে মুমিনরা দ্বীনের জন্য জান এবং মাল দেবে শুধুমাত্র পরকালে জান্নাতের আশায়। দুনিয়ার কোন সম্পদ অর্জনের জন্য নয়। যদি দ্বীনের কাজ তথা- কুরআন শিক্ষাদান, ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত ইত্যাদির বিনিময় দুনিয়াতেই নিয়ে নেয়া হয়, তবে এর বিনিময় কিভাবে পরকালে আশা করতে পারে?

আল্লাহ তায়ালা আরো স্পষ্ট করে বলেন- "অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় কামনা করে না, অথচ তারা সুপথপ্রাপ্ত।" (সূরা ইয়াসীন, আয়াত ২১)

তাহলে আমরা অনুসরন করি কাদের? আমরা যাদের অনুস্মরণ করি বা যাদের কথা মেনে চলি তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো বিনিময় বা অর্থ কি নিচ্ছে না?

কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন- “নিশ্চয় যারা গোপন করে যে কিতাব আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে, তারা শুধু আগুনই তাদের উদরে পুরে। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।(সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৪)

তাহলে আমাদের ঈমাম,ধর্মীয় বক্তারা কি বিনিময় হিসেবে মূল্য গ্রহণ করছেন না?

 

“আপনি বলে দিন আমি এর বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এটা তো বিশ্ববাসির জন্য একটি উপদেশ মাত্র।”(সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৯০)

 

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা নবী (সাঃ) কে বিনিময় না চাওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দিতে বলেছেন।

 পাঠক! প্রত্যেক নবী এবং রাসূলগণের ইতিহাস দেখলে জানতে পারবেন যে, নবী-রসূলগণ এই দ্বীন প্রচারের জন্য বিনিময় তো নেন-ই নাই বরং এই দ্বীন প্রচার করতে গিয়ে জুলুম, নির্যাত, অত্যাচার, জখম সহ্য করেছেন। যে দ্বীন আল্লাহ তায়ালা মানুষের হেদায়াতের জন্য বিনামূল্যে দিলেন, যার প্রচার নবী-রাসূলগণ বিনামূল্যে করলেন আজ সেই দ্বীন শেখানোর কথা বলে মাদরাসা খোলা হয় এবং নির্দিষ্ট বেতনের কম দিলে বলা হয়, এর কম দিলে আপনার সন্তানকে পড়াবো না অর্থাৎ দ্বীনের শিক্ষা দেবো না। মনে রাখবেন ধর্ম কোন ব্যবসায়িক পুজি নয় যে, এটাকে শিক্ষা করে উপার্জনের পুজি হিসেবে ব্যবহার করবেন।

আবার দুনিয়াতে দ্বীনের বিনিময় তো নেওয়া যাবেই না বরং দ্বীনের উপর যারা কায়েম থাকবে আল্লাহ তায়ালাই উল্টো তাদেরকে অভাব অনটনের মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন বলে জানিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- "আর আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। তবে আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত-১৫৫)

এখন প্রশ্ন হলো দ্বীনকে যদি পুজি বানিয়ে ব্যবসা করা হয় তাহলে ধন-সম্পদের কি ক্ষতির কোন আশংকা আছে? বরং এর মাধ্যমেই তো আজ আলেম সমাজ নামে পরিচিত গোষ্ঠিটি মাদ্রাসা খোলে, ওয়াজ করে টাকা কামিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করছে।

চলুন এখন এ বিষয়ে এমন কিছু হাদিস দেখে নেওয়া যাক, যে হাদিসগুলো বর্তমানে আলেমরা নিজেদের স্বার্থে গুপন করছে:

হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।” (সহিহুল জামে ৫৯৮২ নং)

মহানবী (সঃ) বলেছেন, “তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বেহেশত প্রার্থনা কর তাদের পূর্বে, যার কুরআন শিক্ষা করে তার মাধ্যমে দুনিয়া যাচাই করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে, প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি, যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করবে।” (আবু উবাইদ, হাকেম, সিলসিলাহ সহিহাহ ২৫৮ নং)

তিনি বলেন, “তোমরা কুরআন পাঠ কর এবং তার নির্দেশ পালন কর, তার ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শন অ অতিরঞ্জন করো না এবং তার মাধ্যমে উদরপূর্তি ও ধনবৃদ্ধি করো না। (সহিহুল জামে ১১৬৮ নং)

তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদেশ্যে করবে, তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমাদ )

তিনি আরও বলেন, “ যে ব্যক্তি কোন এমন ইলম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি সে তা কেবল মাত্র পার্থিব সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জানাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবি দাউদ, আহমাদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)

লিংক: https://www.hadithbd.com/books/link/?id=2254

 

উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

"আমি আহলুস সুফফার মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছিলাম এবং একটি ধনুক উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।  তিনি বললেন, 'তুমি যদি এটি গ্রহণ করতে চাও, তবে গ্রহণ কর এবং জাহান্নামের একটি আগুন তোমার গলায় ঝুলিয়ে নাও।' (সুনানে আবূ দাউদ, বাবুস সাওয়াব ফিল কুরআন)

 

উসমান বিন আবিল আস ইমামতি প্রার্থনা করে বলেছেন , ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে আমার কওমের ইমাম বানিয়ে দিন।’ মহানবী (সঃ) বললেন, “তুমি তাদের ইমাম। তুমি জামায়াতের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তির খেয়াল করে নামায পড়াবে। আর এমন মুয়াজ্জিন রাখবে, যে আযানের জন্য পারিশ্রমিক নেয় না।” (আবু দাউদ ৫৩১, তিরমিজি ২০৯, নাসাঈ ২/২৩, ইবনে মাজাহ ৯৮৭ নং, ত্বাবারানী, সহিহুল জামে ৩৭৭৩ নং)

এ নির্দেশ স্পষ্টতঃ যদিও মুআয্যিনের জন্য, তবে ইমামের ক্ষেত্রে এ নির্দেশ অধিকতর প্রযোজ্য।

 লিংক : https://www.hadithbd.com/books/link/?id=2256

যারা নিজেদের স্বার্থে ফতোয়া বানিয়ে টাকা নেওয়াকে বৈধ করেছেন, তাদেরকে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, দেখুন এভাবে মাদারাসা খুলে যদি টাকা নেওয়া জায়েজ হতো তাহলে মক্কা বিজয়ের পর নবী (সাঃ) এবং সাহাবাগণ বড় বড় মাদরাসা খুলতে পারতেন।আর আপনাদের ভাষায় খেতমতও করতে পারতেন এবং আপনাদের মতো লাভবানও হতে পারতেন।কিন্তু ইতিহাসে তেমনটি পাবেন না। কারণ এভাবে দ্বীনী শিক্ষা ও প্রচারের বিনিময় নেওয়া হারাম (আর উপরে আয়াত ও হাদিস দ্বারা সেটা পরিষ্কার দেখিয়ে এসেছি) বলেই তারা কোন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন নাই। তারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সমাজে ও রাষ্ট্রেই দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু আজ রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই অথচ মাদ্রাসার অভাব নেই। ফলে মানুষ কুরআনের হাফেজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্র চলছে তাগুতি আইন দিয়ে। আর এই তাগুতি আইনের ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান লংঘিত হচ্ছে। যেমন- আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন অথচ রাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে সুদভিক্তক। আল্লাহ চুরের হাত কর্তন করতে বলেছেন কিন্তু তারা সামান্য জরিমানা ধরে চুরকে ছেড়ে দিচ্ছে।ফলে চুরি তো কমছেই না বরং চুর আরও উৎসাহিত হচ্ছে। আল্লাহ ধনীদের থেকে যাকাত আদায় করে গরীবদের প্রদান করতে বলেছেন। কিন্তু এই রাষ্ট্রে সরকার বা সমাজের কেউ ধনীদের থেকে যাকাত নিচ্ছে না এবং গরীবদের মাঝে বন্টন করছে না। উল্টো ধনীরা গরীবদেরকে সুদের জালে বন্দি করে আরও বেশি করে শোষণ করছে। আল্লাহ ঘোষণা করেন- “সাবধান! সৃষ্টি যার, হুকুমও চলবে তারই।” (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৪৪) অথচ এত মাদরাসা, এত আলেম-উলামা, পীর-বুযুর্গ আর এত শায়েখ থাকতেও কি এই রাষ্ট্রে আল্লাহর বিধান চলছে?


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন